সাম্যবাদ ও মানবতার কবি নজরুল ইসলাম

Ainun Nahar    ০৪:৩০ পিএম, ২০১৯-০৫-৩০    70


সাম্যবাদ ও মানবতার কবি নজরুল ইসলাম

“আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন। আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী।’ রাজবন্দির জবানবন্দিতে উপরোক্ত কথাগুলো বলেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের উর্ধ্বে ছিলেন বলেই লিখেছেন-‘গাহি সাম্যের গান/যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান/ যেখানে মিশেছে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টান।”
বাঙালি জনমানসে নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) এক বিরল প্রজ প্রতিভা বিস্ময়কর প্রতিভা। মাইকেল পরবর্তী বাংলা কাব্যকাশে আবির্ভাব মুহূর্তেই প্রতিভার আলোকচ্ছটায় যে কবি সত্তা সমকালীন সমাজও রাষ্ট্র মানসে প্রবলভাবে

নাড়া দিয়েছিল তিনি বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম। রবি প্রতিভার সর্বব্যাপী প্রভাবে যখন বাঙালি জাতি বিভোর তখনি ‘অগ্নিবীণা’ বাজিয়ে ধুমকেতুর তীব্র ঔজ্জ্বল্য এবং জ্বালা নিয়ে আবির্ভূত হলেন নজরুল দ্রোহের এতো অহংকার, ভাঙাগড়ার এত কারুকাজ আবেগের এতো উচ্ছ্বাস- ইতোপূর্বে আর দেখা যায়নি বাংলা কবিতা, বাঙালি জীবন এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে। নজরুলের পূর্বসুরিরা বলেছেন- ‘জাগো দেশ, জাগো জাতি’, নজরুল বললেন-“জাগো নিপীড়িত, জাগো কৃষক, জাগো শ্রমিক, জাগো নারী”, স্বাধীনতার সাথে নির্যাতিত শ্রেণির মানুষের মুক্তি, এবং বুর্জোয়া সামন্ততন্ত্রের পরিবর্তে সাম্যের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে এক রাষ্ট্র- এটি ছিল তাঁর স্বপ্নকাব্যে-গানে-গল্পে বা উপন্যাসে বা প্রবন্ধে বা ভাষণে এই মানবতার বাণী উচ্চারণ করেছেন বারে বারে। এখানেই তাঁর স্বাতন্ত্র স্পষ্ট এবং এখানেই তিনি যুগোত্তর।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, ঐপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার গায়ক ও অভিনেতা বৈচিত্র্যময় অসংখ্য রাগরাগিনী সৃষ্টি করে বাংলা সঙ্গীত জগতকে মিনি মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বস্তুতপক্ষে নজরুল যুগটাই ছিল এক প্রচণ্ড ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ যুগ এবং উত্তাল আলোড়ন ও আন্দোলনের যুগ, প্রথম মহাযুদ্ধে ধ্বংসলীলা মাত্র শেষ হয়েছে যুদ্ধের পর বাজার মন্দা, অর্থনৈতিক সংকট, বেকার সমস্যা শত শত যুবকের আত্মহত্যা-পুজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের থাবা বিস্তার, চোরাকারবারীদের দোর্দন্ড প্রতাপ এবং মানবাত্মার অপমান, পুরোনো আদর্শবাদের পরিবর্তন-একই সাথে তিনি দেখেছেণ দুর্ভিক্ষের কঠিন থাবায় সাধারণ মানুষের কষ্ট সব কিছ্থর সাথে যুক্ত হয়েছে তাঁর জীবনের শুরু থেকেই অস্তিত্বের সংগ্রাম, এবং ‘দুখু’ মিয়ার জীবন সংগ্রাম যা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নানাভাবে তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেধে রেখেছিল। তাইতো তিনি সবসময় কথা বলেছেন সাধারণ মানুষের পাশে নজরুলের সাম্যবাদ সর্বব্যাপী, সর্বপ্লাবী, যেখানে নেই কোন ভন্ডামী বা ভনিতা নজরুল মানসের অসাধারণ বৈশিষ্ট্যই তিনি যা বিশ্বাস করেছেন-তাই বলেছেন তাই করেছেন যেকারণে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন ‘ধর্মের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য ধর্ম” আবার একই সাথে প্রতিটি মানুষের মাঝেই তিনি স্রষ্টাকে প্রত্যক্ষ করেছেন
“এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোন মন্দির কাবা নাই” কিংবা কারো মনে তুমি দিওনা আঘাত/ সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে/ মানুষেরে তুমি যতো কর ঘৃণা/ খোদা যান তত দুরে সরে-/ মানবতার সাথে সাম্যের বাণী যাঁর সৃষ্টিতে বারে বারে উচ্চারিত হয়েছে-তিনি আমাদেরই নজরুল। মাত্র ২৩ বছরের সৃষ্টিশীল সাহিত্যজীবনে যে অজস্‌্র কবিতা-গান নজরুল লিখেছেন তা থেকে তাঁর সৃজনী শক্তি এক পরম বিস্ময়ের। “আমার মাথা নত করে দাও হে আমার চরণ ধুলার তলে-রবীন্দ্রনাথের এই আত্মসমর্পনের ক্ষেত্রে নজরুল আনেন বিদ্রোহবাণী “আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেই পদচিহ্ন/ আমি স্রষ্টা-সুদন/ শোক-তাপ-হানা খেয়াল বিধির কক্ষ করিব ভিন্ন। (বিদ্রোহী-অগ্নিবীণা) বুদ্ধ দেব বসু তাই বলেছেন নজরুলের কবিতায় সামাজিক-রাজনৈতিক বিদ্রোহ আছে, কিন্তু সাহিত্যিক বিদ্রোহ নেই। আর সামাজিক রাজনৈতিক বিষয়কে কবিতা করে তুলে আবহমান বাংলা কবিতারই বিষয়ের সম্প্রসারণ ঘটালেন নজরুল এই বিদ্রোহই তাঁর সাহিত্যিক বিদ্রোহ। সে হিন্দু মুসলমান হাজার বছর ধরে বাংলাদেশে পাশাপাশি বাস করছে নজরুল তাদের মিলনবাণী উচ্চারণ করলেন গভীরভাবে (হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?/ কান্ডারী! বলো ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।” কান্ডারী হুশিয়ার, সর্বহারা।
নজরুল চেতনায় মানবতার জয়গানে ‘কে কুলি মজুর আর কে সাহেব-সব সমান। আশরাফ আর আতরাজের নেই ব্যবধান-সবাই সৃষ্টির সেরা মানুষকে তিনি কখনো ঘৃণার চোখে দেখেননি-“বন্ধু, তোমার বুকভরা লোভ, দুচোখে স্বার্থ ধুলি/ নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হয়েছে কুলি।” বাঙালির অফুরন্ত আবেগ, বাঁধনহারা উচ্ছ্বাস আর প্রবল প্রাণশক্তিকে আপন আত্মায় ধারণ করে তিনি দ্রোহ, প্রেম সাম্য ও মানবতার বাণী শুনিয়েছেন ফাঁসীর মঞ্চে দাড়িয়েও তিনি মানবতার ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সাম্যবাদের কথা বলেছেন-সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অমর প্রতিদ্বন্দ্বী কাজী নজরুল ইসলাম মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছিলেন নির্ভীক ও অসম সাহসী এক কবি। তিনি কেবল সাম্যের বাণী প্রচার করেননি, অসাম্যের কুৎসিত রূপটি বা ভয়াবহতা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছেন এবং কর্ম ও সাধনা দিয়ে অসাম্য দূর করার চেষ্টা করেছেন এমন এক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছেন-যেখানে সবাই মিলে সাম্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করবে আনবেনা মানুষ মানুষে বৈষম্য হানাহানি এমনকি তিনি পাপী-তাপী-চোর ডাকাতদেরও মানুষের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার সার্বিক প্রয়াসের আশা ব্যক্ত করেছেন। পরম মমতায়। নজরুল সাহিত্যে সাম্যের যে অমিয় খরা তাঁর উৎসমূলে এ কথা বলাই যথেষ্ট যে, তাঁর সৃষ্টি কোন বিলাসিতা ছিল না বরং জীবনের অভিজ্ঞতা সঞ্চিত ড. সুশীল কুমার গুপ্ত লিখেছেন “নজরুল কাব্যের বিদ্রোহত্মক ভাবই পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে সাম্যবাদী ধারণা প্রচারে নজরুলের অবদান অবশ্য স্বীকার্য বহু শিরোনামায় বিভক্ত “সাম্যবাদী” কবিতায় নজরুল সাম্যবাদের প্রতি যে বিশ্বাস ও আন্তরিকতা দেখিয়েছেন তার তুলনা বাংলা সাহিত্যে প্রায় নেই বললেই চলে।”
প্রগতির কবি তিনি-প্রচলিত রাষ্ট্রীয় সমাজ ব্যবস্থা, সংস্কারের মূলে তিনি কবিতার ক্ষুরধার বাণীতে আঘাত করেছেন-যেকালে অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার দেখেছেন সেখানেই তিনি সোচ্চার হয়েছেন। এখানে উল্লেখ্য জোসেফ ম্যাচসিনি যেমন বলেছেন। -“তোমার সমাজের যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে যদি তুমি সোচ্চার না হও তবে তুমি তোমার সমাজ ও কর্তব্যের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করলে।” নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী সত্তা এখানে কোন ধরনের আপোষ করেনি। তাঁর ভাষায় “অত্যাচারকে অত্যাচার বলেছি, মিথ্যাকে মিথ্যা বলেছি, কাহারো তোষামোদ করি নাই, প্রশংসার ও প্রসাদের লোভে কাহারো পেছনে পোঁ ধরি নাই- আমি শুধু রাজার বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করি নাই, সমাজের জাতির, দেশের বিরুদ্ধে আমার সত্য তরবারী তীব্র আক্রমণ সমাজ বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে।”
বিংশশতাব্দীর কঠিন সময়ে কাজী নজরুল ইসলাম মানবতা ও সাম্যবাদের জন্য যে যুদ্ধ করেছেন এবং তিনি যেভাবে তাঁর সামগ্রিক চেতনায় আমাদের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে প্রেরণা হয়েছেন আজ এ স্বাধীন দেশে আমরা কি তাঁর কাঙ্ক্ষিত বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি? প্রতিনিয়ত দেখছি মানবতার বিপর্যয় মানুষে মানুষে বৈষম্য শ্রেণি বিভাজন, ভোগবাদের নির্লজ্জ রূপ নারীর প্রতি সহিংস আচরণ কৃষকের কান্না এবং মুনাফালোভীর উত্থান। একই সাথে কিছু ক্ষমতাও পদক লোভী বুদ্ধিজীবীদের চাটুকারিতাও মনে করিয়ে দেয় নজরুলের আদর্শ ও নীতিকে তিনি সুবিধাবাদীদের মতো স্বার্থ উদ্ধারের জন্য হৃদয়বৃত্তিকে হনন করেননি।
তাঁর জীবনের সর্বশক্তি দিয়ে সব অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে লড়েছেন এবং সৃষ্টি করে গেছেন অনবদ্য সব সাহিত্য, বাংলা সাহিত্যকে দিয়ে গেছেন অংহকারের একটি জায়গা-শিল্প সাহিত্যের নানা শাখায় আজও “উন্নত মম শির’ অন্তহীন প্রেরণার উৎস কাজী নজরুল ইসলাম এখনও প্রাসঙ্গিক দ্রোহ, প্রেম, সাম্য, মানবতা ও শোষিত মানুষের মুক্তির বার্তা নিয়ে আসা কবির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

সূত্র দৈনিক আজাদী


রিটেলেড নিউজ

 বীরাঙ্গনা

বীরাঙ্গনা

Times of Bangladesh

                বীরাঙ্গনা আমি নেশায় আচ্ছন্ন হয়নি,দেখেছি ভয়াল রাত। শুকুরের দল ... বিস্তারিত

বাবা দিবস: বিশ্বজুড়ে কীভাবে উদযাপন করা শুরু হলো?

বাবা দিবস: বিশ্বজুড়ে কীভাবে উদযাপন করা শুরু হলো?

Ainun Nahar

বিশ্বের অনেক দেশে আজ পালন করা হচ্ছে বাবা দিবস। জুন মাসের তৃতীয় রবিবার এই দিনটি পালন করা হয়। এ দ... বিস্তারিত

যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারায় তৈয়বা বেগমের শিল্পকর্ম

যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারায় তৈয়বা বেগমের শিল্পকর্ম

Ainun Nahar

নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের আর্ট গ্যালারি সুন্দারাম ট্যাগর চেলসিতে শুরু হয়েছে বাংলাদেশের শিল্পী তৈ... বিস্তারিত

কলেজ সরকারি বেতন-ফি বেসরকারি!

কলেজ সরকারি বেতন-ফি বেসরকারি!

Muahammad Afser

চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর মাসিক বেতন মাত্র ২০ টাকা। চট্টগ্রাম সরকার... বিস্তারিত

 ২১ রানে শেষ ৫ উইকেট হারিয়ে পার্থে হারল ভারত

২১ রানে শেষ ৫ উইকেট হারিয়ে পার্থে হারল ভারত

Md. Motiur Rahman

পার্থ টেস্টে জয়ের জন্য ২৮৭ রানের লক্ষ্য ছিল ভারতের সামনে। কাল চতুর্থ দিন শেষে অস্ট্রেলিয়া মাত্র ১... বিস্তারিত

 রোনালদোর গোলে নতুন রেকর্ড

রোনালদোর গোলে নতুন রেকর্ড

Times of Bangladesh

১২ গজ দূর থেকে শট নেওয়ার ব্যাপারে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ধারেকাছে আপাতত কেউ নেই। পেনাল্টি বক্সের ... বিস্তারিত

সর্বশেষ

এলার্জি আছে? টানা ২১ দিন এই খাবারটি খান, এলার্জি হবে চিরবিদায় |

এলার্জি আছে? টানা ২১ দিন এই খাবারটি খান, এলার্জি হবে চিরবিদায় |

Razibul Islam

কোন বিশেষ ধরনের খাবার অনেকেরই কম বেশি এলার্জি থাকে। এ এক এমনই বিচ্ছিরি সমস্যা যার জন্য আপনি নিজের ... বিস্তারিত

সেই চেনা রূপে এই বর্ষা

সেই চেনা রূপে এই বর্ষা

Rokeya Begum

ভরা আষাঢ়েও বৃষ্টি নেই। এ নিয়ে হা-হুতাশের শেষ ছিল না নগরবাসীর। তবে কি ষড়ঋতুর বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে ... বিস্তারিত

জ্বর হলে অবহেলা না করে ডেঙ্গু পরীক্ষার আহ্বান

জ্বর হলে অবহেলা না করে ডেঙ্গু পরীক্ষার আহ্বান

Rokeya Begum

 বৃষ্টি ও আবহাওয়ার তাপমাত্রার সঙ্গে ডেঙ্গুর একটা সম্পর্ক রয়েছে মন্তব্য করে জ্বর হলেই অবহেলা না ... বিস্তারিত

চুল পড়া প্রতিরোধে রসুন

চুল পড়া প্রতিরোধে রসুন

Rokeya Begum

চুল পড়া রোধে পেঁয়াজের রস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সেই সঙ্গে রসুনও অনেকটা ম্যাজিকের মতো কাজ করে। ... বিস্তারিত